বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক পণ্য

জ্বালানি তেলের জায়গা দখল করে নিচ্ছে দুষ্প্রাপ্য খনিজ

বিগত বিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতিতে অনেকটাই নিয়ন্ত্রক পণ্যের ভূমিকা পালন করেছে জ্বালানি তেল।

বিগত বিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতিতে অনেকটাই নিয়ন্ত্রক পণ্যের ভূমিকা পালন করেছে জ্বালানি তেল। বিশ্বব্যাপী ভূরাজনীতির বড় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল পণ্যটির মজুদ, উৎপাদন (উত্তোলন ও পরিশোধন) ও বাণিজ্যপ্রবাহ। যুদ্ধের কারণ তৈরি বা ফলাফল নির্ধারণেও জ্বালানি তেলের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পণ্যটির প্রাচুর্য মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের কিছু দেশের ব্যাপক সম্পদশালী হয়ে ওঠার পেছনে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এখনো আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে অন্যান্য পণ্যের দাম নির্ধারণেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি। শিল্প উৎপাদনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে এ জীবাশ্ম জ্বালানির দামের উত্থান-পতনকে দেখা হয় বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির ইঙ্গিতবাহী হিসেবে। অনেক সময় পণ্যটির বাজার অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী লাগামহীন মূল্যস্ফীতিরও কারণ হয়ে উঠতে দেখা গেছে।

তবে প্রযুক্তির উল্লম্ফন ও শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতির প্রভাবক উপাদানগুলোর বিন্যাস ও ধরনও এখন বদলে যাচ্ছে। ক্রমেই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের জায়গা দখল করে নিচ্ছে দুষ্প্রাপ্য খনিজ ধাতু। এআই প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার, স্মার্টফোন ও প্রতিরক্ষা শিল্প এবং মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ এসব খনিজকে এখন ক্রমেই বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসছে। বিষয়টিকে আরো ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলমান গ্রিনল্যান্ড বিতর্ক থেকে শুরু করে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ শুল্কচুক্তি ও নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ নিয়ে তার বর্তমান অবস্থানের পেছনে বিরল খনিজ ধাতুর স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার তাগিদ বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

বর্তমানে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে চীনের অবস্থানকে আরো দৃঢ় করে তুলেছে বিরল খনিজ ধাতুর বাজারে দেশটির একাধিপত্য। আশির দশকে দেশটির রাজনীতিবিদ দেং জিয়াওপিং বলেছিলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের আছে জ্বালানি তেল। আর চীনের আছে বিরল খনিজ ধাতু।’

সে সময় বিশ্বব্যাপী শক্তি ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল জ্বালানি তেল। কয়েক দশক পর এসে মন্তব্যটিকে অতি দূরদর্শী মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিরল খনিজের বাজারে নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় উঠে এসেছে চীন। এ নিয়ন্ত্রক ভূমিকাই যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক দর কষাকষিতে এগিয়ে রাখছে চীনকে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের প্রভাব অন্তত আরো এক দশক বজায় থাকবে বলে মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দৈনিক চাহিদা এখনো ১০ কোটি ব্যারেলের বেশি। বেশির ভাগ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দশক পর্যন্ত এ চাহিদা শক্তিশালী থাকবে।

দীর্ঘসময় ধরে বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীল জ্বালানি তেল বাজার গড়ে উঠেছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সাধারণ সমুদ্রপথে জাহাজে পরিবহন করা হয়। কৌশলগত মজুদ হিসেবেও সংরক্ষণ করা যায়। বৈশ্বিক সূচকের মাধ্যমে সহজে কেনা-বেচাও হয়। শক্তিশালী ব্যবস্থাপনার কারণে সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে ধীরে বা দ্রুত সামঞ্জস্য করা যায়।

আর দুষ্প্রাপ্য খনিজের ক্ষেত্রে বিষয়টি পুরোপুরি ভিন্ন। এটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় না বা প্রতিদিন বিশাল পরিমাণে বাণিজ্য হয় না। তবে এটি বর্তমান বিশ্বের ইলেকট্রিফিকেশন, অটোমেশন ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ভিত্তি। সরাসরি বিভিন্ন যন্ত্র বা প্রযুক্তির অংশ হিসেবে ব্যবহার হয় এসব দুষ্প্রাপ্য খনিজ। এসব বিরল খনিজ থেকে তৈরি স্থায়ী চুম্বক বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) মোটর, উইন্ড টারবাইন, রোবোটিকস, ফ্লাইট সিস্টেম ও উন্নত সামরিক হার্ডওয়্যারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডাটা সেন্টার ও এআই অবকাঠামোর ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গেও এগুলোর চাহিদা বাড়ছে।

কানাডার টরন্টোয় গত বছরের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয় রেয়ার আর্থ মাইনস, ম্যাগনেটস অ্যান্ড মোটরস সামিট। সেখানে দুষ্প্রাপ্য খনিজকে উদীয়মান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন ব্যাংক অব আমেরিকার পণ্যবাজার বিশ্লেষক লসন উইন্ডার।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে নিওডিমিয়াম ম্যাগনেটের চাহিদা সম্প্রসারণের বার্ষিক চক্রবৃদ্ধির হার (সিএজিআর) হবে প্রায় ৯ শতাংশ। একই সময় যাত্রীবাহী ইভি ও রোবোটিকসের ক্ষেত্রে এ চাহিদা সম্প্রসারণের হার হবে যথাক্রমে ১১ ও ২৯ শতাংশ।

২০৩৫ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে চুম্বকের চাহিদা বাড়বে এখনকার তুলনায় পাঁচ গুণ। আর ইউরোপে বাড়তে পারে আড়াই গুণ। সে তুলনায় বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা বৃদ্ধির হার সীমিত থাকতে পারে ১ শতাংশের নিচে।

এমন এক সময় দুষ্প্রাপ্য খনিজের চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী, যখন ইউরোপে মূল্যবান এ ধাতবের নিজস্ব খনি বা প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা প্রায় নেই। ব্যাংক অব আমেরিকার পূর্বাভাস অনুসারে, চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুষ্প্রাপ্য খনিজের ঘাটতি আরো বেড়ে যাবে। বর্তমানে নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়ামসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুষ্প্রাপ্য খনিজ ধাতুর প্রায় ৯০ শতাংশ উত্তোলন করে চীন। ডিসপ্রোজিয়াম ও টার্বিয়ামসহ সব ধরনের ভারী দুষ্প্রাপ্য খনিজ ধাতুর প্রায় পুরোটাই উত্তোলন করে দেশটি। বিশ্বের বিরল খনিজ চুম্বকের প্রায় ৮৯ শতাংশ মজুদই চীনের দখলে।

দুষ্প্রাপ্য খনিজের প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতায়ও এগিয়ে চীন। এসব ধাতুর বৈশ্বিক প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতার প্রায় ৮৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে দেশটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, জটিল উৎপাদন ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ মিলিয়ে জ্বালানি তেলের মতো স্থিতিশীল অবস্থায় নেই দুষ্প্রাপ্য খনিজের বাজার। বরং গত বছর প্রবর্তিত চীনের রফতানি নিয়ন্ত্রণনীতি অবাধ সরবরাহ ব্যবস্থাকে সংকুচিত করছে।

বৈশ্বিক উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এ খাতে যন্ত্র ও অবকাঠামো নির্মাণে দুষ্প্রাপ্য খনিজের ব্যবহার অত্যাবশ্যকীয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২২ভি রিসার্চের প্রধান জর্ডি ভিসার জানান, এআই অবকাঠামোর যন্ত্র ও হার্ডওয়্যার নির্মাণ পুরোপুরি বিরল খনিজের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এআই অবকাঠামো নির্মাণে প্রতিযোগিতা করলেও তাদের পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় চীনের প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতার ওপর। এটি এমন এক বড় ধরনের কৌশলগত দুর্বলতা, যা অল্প সময়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানোর দাবি জোরালো হয়ে এলেও জ্বালানি তেল এখনো অপরিহার্য। পণ্যটির দাম এখনো বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও বাণিজ্য ভারসাম্যকে প্রভাবিত করছে। কিন্তু কোন দেশ কী তৈরি করতে পারবে, তা নির্ধারণ করছে দুষ্প্রাপ্য খনিজের প্রাপ্যতা। এমনটি উল্লেখ করে ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষক লসন উইন্ডার বলেন, ‘বিরল খনিজ এখন বড় সুযোগ ও বড় চ্যালেঞ্জ উভয়ই তৈরি করছে। এটি একদিকে উৎপাদনকারীদের জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করছে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের সরকারের সামনে সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরছে।’

এখন পুরো সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বের ওপর বটলনেক পরিস্থিতি তৈরি করেছে চীন। উইন্ডারের মতে, বৈশ্বিক আধিপত্য এখন আর জ্বালানির ওপর নয়, বরং এ বটলনেক নিয়ন্ত্রণের ওপরও নির্ভর করছে।

ইউরোনিউজ অবলম্বনে

আরও